চিরকুট লিখে হাসপাতালে অপরিচিত নারীর কোলে নবজাতক রেখে পালাল মা
মোবাইল নম্বরের সূত্রে মিলল বাবা-মায়ের পরিচয়**
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : মোঃ শিমুল হোসেন
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিরকুট লিখে অপরিচিত এক নারীর কোলে ২৩ দিন বয়সী নবজাতক রেখে পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত চিরকুটে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে শিশুটির বাবা-মায়ের পরিচয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছেই হস্তান্তর করা হয়।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে এ ঘটনা ঘটে। যাঁর কোলে শিশুটিকে রেখে যাওয়া হয়েছিল, তিনি মোছা. মিষ্টি আক্তার (২৫)। তিনি ঈশ্বরদী উপজেলার জয়নগর গ্রামের মো. সাগর হোসেনের স্ত্রী।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জ্বর ও ঠান্ডাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান মিষ্টি আক্তার। চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষার সময় এক অপরিচিত নারী তার কাছে এসে বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে ২৩ দিন বয়সী শিশুটিকে সাময়িকভাবে কোলে রাখতে অনুরোধ করেন। মানবিক কারণে শিশুটিকে কোলে নেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ওই নারী আর ফিরে আসেননি।
পরবর্তীতে শিশুটির গায়ে জড়ানো কাপড়ের ভেতর একটি সাদা কাগজে লেখা চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল—
‘আপনি বাচ্চাটিকে হেফাজত রাখবেন। বাচ্চাটির জন্ম ১ জানুয়ারি।’
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে মিষ্টি আক্তার শিশুটিকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলী এহসানের কক্ষে গিয়ে পুরো ঘটনা অবহিত করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঈশ্বরদী থানা পুলিশকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তদন্ত শুরু করে।
এ ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শিশুটিকে একনজর দেখতে হাসপাতালে ভিড় জমান সাধারণ মানুষ। কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কেউ আবার চোখের জলে প্রশ্ন তোলেন—কোন অসহায়তা একজন মাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে?
ঈশ্বরদী আমবাগান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আফজাল হোসেন জানান, চিরকুটে লেখা মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে শিশুটির পরিবারের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নম্বরটি আশরাফ আলী নামে এক ব্যক্তির বলে নিশ্চিত হলে তাকে ডেকে আনা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তিনি শিশুটিকে রেখে যাওয়া নারীকে শনাক্ত করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী দাশুড়িয়া নওদাপাড়া গ্রামের ইমারুল ইসলামের স্ত্রী মুক্তা খাতুন। তার আরও একটি পাঁচ বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে। গত ২৭ ডিসেম্বর রাজশাহীতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কন্যাসন্তান জন্ম হয়। শিশুটির নাম রাখা হয় তুবা খাতুন।
তবে কী কারণে তিনি এমনভাবে নবজাতককে ফেলে চলে যান—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।
সবশেষে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করে। তবে এই ঘটনা সমাজে গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে—মায়ের অসহায়ত্ব, সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার দায় আসলে কার?
ঘটনাটি ঈশ্বরদীতে ‘টক অব দ্য টাউনে’ পরিণত হয়েছে।