পাইকগাছার চাঁদখালীতে সরকারি ওয়াবদা, খাস জমি, কবর, শ্মশান সবই পুড়ছে ইট ভাটার আগুনে। পরিবেশ অধিদপ্তর পরেছে কাঠের চশমা
শেখ মাহতাব হোসেন পাইগাছা থেকে ফিরে
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার ৯নং চাঁদখালী ইউনিয়ন আজ পরিবেশ ধ্বংসের এক ভয়াবহ উদাহরণ।একদিকে অবৈধ ইটভাটা অন্যদিকে অবৈধ কাঠ কয়লার চুল্লি। সরকারি ওয়াবদা রাস্তা ও খাস জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইট ভাটায় এবং শতশত গাছ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে কাঠ কয়লা। দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে এলাকাটি আজ পরিণত হয়েছে এক নীরব পরিবেশ বিপর্যয়ের কেন্দ্রে।
স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে কিছু অসাধু মাটি ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ওয়াবদা রাস্তা ও শত শত বিঘা খাস জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে। এর ফলে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ওয়াবদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নদীর পানি ঢুকে পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা ও ফসল হারানোর আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে রয়েছে।
অনুসন্ধান বলছে পাইকগাছা উপজেলায় প্রায় ১৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি রয়েছে চাঁদখালী ইউনিয়নে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—
একটিও ভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের বৈধ ছাড়পত্র নেই। ভাটাগুলোর মধ্যে দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে ৫০০ হাতেরও কম, যেখানে আইন অনুযায়ী ন্যূনতম ১ কিলোমিটার বাধ্যতামূলক। ফলে সবগুলো ভাটাই কার্যত অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এবিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন কার্যকারী ভূমিকা নেই।
ইটভাটার পাশাপাশি এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ কাঠ কয়লার চুল্লি। কাঠের চুল্লি গুলো বৃক্ষ উজাড়ের নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। এই চুল্লিগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—দেশিয় প্রজাতির গাছ, রাস্তার পাশের গাছ ,বাগান ও বসতভিটার বৃক্ষ।প্রতিদিন হাজার হাজার গাছ কেটে কয়লা বানানোর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। বৃক্ষ নিধনের এই উৎসবে যেন কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই।
কাঠ কয়লার চুল্লি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে দেখা দিচ্ছে—
শ্বাসকষ্ট,হাঁপানি,চোখ জ্বালা,চর্মরোগ।শিশু ও বৃদ্ধদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা।
স্থানীয়রা বলছেন, ধোঁয়ার কারণে দিনের পর দিন ঘরে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এটি একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট।
এই অবৈধ ইটভাটা গুলি সরাসরি লঙ্ঘন করছে-
১.ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন,২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)। পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ভাটা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২.বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, (১৯৯৫)। বায়ু দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান।
৩.বন আইন, ১৯২৭ (সংশোধিত)।অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা ও কাঠ পোড়ানো ফৌজদারি অপরাধ।
৪.সরকারি সম্পত্তি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন।
5.খাস জমি ও ওয়াবদা কাটাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী এসব অপরাধে ভাটা বন্ধ, চুল্লি উচ্ছেদ, মোটা অঙ্কের জরিমানা ও জেল—সবকিছুরই বিধান আছে।
এসব অবৈধ ইট ভাটা ও কাঠ কয়লার পাশেই রয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যথাক্রমে চাঁদখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদখালী বহুমুখী হাই স্কুল, চাঁদখালী কলেজ, জামিয়া ইসলামিয়া শামসুল উলুম মাদ্রাসা, খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন হলো—
এই অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের চোখের সামনেই চললেও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই?
তবে কি প্রভাবশালীদের কাছে আইন জিম্মি?
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। নীরবে সহ্য করছে পরিবেশ ধ্বংস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। চাঁদখালীর সাধারণ মানুষের অসহায় চোখে আজ একটাই প্রশ্ন- এই অবৈধ ইটভাটা ও কাঠের চুল্লি থেকে তারা কবে মুক্তি পাবে?