সুন্দরবনের উপহার গোলফল: উপকূলের জীবন, জীবিকা ও সম্ভাবনার নীরব অর্থনীতি
শেখ মাহতাব হোসেন
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
ডুমুরিয়া ও কয়রার উপকূলীয় গ্রামগুলোয় হাঁটলে মনে হয়, যেন সুন্দরবনের সবুজ ছায়া এসে মিশে গেছে গ্রামবাংলার চরভূমিতে। নদীপারের ঝোপঝাড়ে থোকা থোকা ঝুলে থাকা তালকাঁদির মতো ফলগুলো স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘গোলফল’ নামে। সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পামজাতীয় উদ্ভিদ গোলপাতাগাছের এই ফল আজ শুধু প্রকৃতির দান নয়, বরং উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকার অনন্য অংশ।
গোলফল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো, আবার শাঁসের গঠন ও স্বাদ তালের শাঁসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান—বিশেষ করে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি। লোকজ চিকিৎসায় কৃমি দমন, পানিশূন্যতা পূরণ, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও চর্মরোগ নিরাময়ে এই ফল ব্যবহৃত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
গোলপাতাগাছের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। এর পাতা ঘরের ছাউনির কাজে ব্যবহৃত হয়, ফলের শাঁস খাদ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ফলের কাঁদি থেকে রস সংগ্রহ করে তৈরি করা হচ্ছে উন্নতমানের গুড়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ও সিনিয়র মনিটরিং অফিসার (পার্টনার) মো. মোছাদ্দেক হোসেন জানান, গোলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাত্র ৩৫ হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীরাও এটি নিরাপদে গ্রহণ করতে পারেন। তিনি বলেন, “খুলনা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ লবণাক্ত পতিত জমি রয়েছে। সেখানে গোলপাতা চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এ লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।”
গোলপাতাগাছের কাণ্ড মাটির নিচে অবস্থান করে, ওপরের অংশে ছড়িয়ে পড়ে নারকেলপাতার মতো সবুজ পাতা। গাছের গোড়ায় ধরে মোচাকৃতির ফুল ও ফলের কাঁদি। প্রতিটি কাঁদিতে ৫০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত ফল থাকে। অপরিপক্ব ফল কালচে-বাদামি রঙের হলেও পরিপক্ব হলে শক্ত খোসার ভেতর নরম ও পুষ্টিকর শাঁস পাওয়া যায়।
গোলফলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এর রস। অগ্রহায়ণ মাসে গাছিরা ফলের কাঁদির ডগা কেটে রস সংগ্রহ শুরু করেন। এই রসের ঘনত্ব খেজুরের রসের তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে ১৬ কলসি খেজুরের রস থেকে এক কলসি গুড় পাওয়া যায়, সেখানে মাত্র ৮ কলসি গোলের রসেই তৈরি হয় সমপরিমাণ গুড়। এই গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস তৈরি হয়; অনেকেই কাঁচা রস পান করেন।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, খুলনার উপকূলীয় এলাকায় বছরে প্রায় ১০ হাজার টন গোলের গুড় উৎপাদিত হয়। শত শত পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। ঐতিহাসিকভাবে এই রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কৌশল এসেছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর হাত ধরে। ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে আগত রাখাইনরা এই ঐতিহ্য উপকূলে ছড়িয়ে দেন।
তবে গোলফলের বাণিজ্যিক বাজার এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। সাধারণত বনজীবী ও উপকূলের মানুষই এটি ভোগ করেন। ব্যতিক্রম হিসেবে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের পাশে আবদুর রহমান শেখ চার বছর ধরে পর্যটকদের কাছে গোলফল বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
সুন্দরবনের গভীরে অনুমতি নিয়ে গোলপাতা সংগ্রহে যান যাঁরা, তাঁদের বলা হয় বাওয়ালি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে তাঁদের সংগ্রহ মৌসুম। এই কাজ যেমন শ্রমসাধ্য, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ—কারণ গোলপাতার ঝোপেই ওঁৎ পেতে থাকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।
দেশভেদে গোলপাতার নাম ভিন্ন হলেও গুরুত্ব এক। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গোলপাতা, মিয়ানমারে দানি, মালয়েশিয়ায় নিপাহ, ফিলিপাইনে নিপা—সবখানেই এটি উপকূলীয় সংস্কৃতির অংশ।
গোলপাতা শুধু একটি গাছ নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনার প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে গোলফলের এই নীরব অর্থনীতি একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের উপকূলের বড় সম্পদ।